Friday, September 30, 2022

গুচ্ছ ভর্তি: আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হচ্ছে কুবি

সমন্বিত গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার কারণে আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হচ্ছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি)। বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন বিভাগে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষার মাধ্যমে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দকেই মূলত খাটো করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটোছুটি, ভর্তি বিড়ম্বনা, অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত খরচসহ পদে পদে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। আবার প্রতিটি ইউনিটেই ১০ থেকে ১২ টি মেধাতালিকার পরেও প্রায় ১৪ শতাংশ আসন খালি রয়েছে।

বিভাগুলো ঘুরে দেখা যায়, গণিত বিভাগের ক্লাসে উপস্থিত হওয়া ৩৫ জনের মধ্যে ২৪ জনের বাড়িই বৃহত্তর কুমিল্লা অর্থাৎ কুমিল্লা, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, লক্ষীপুর ও চাঁদপুর জেলায়। আর বাকীদের মধ্যে চট্টগ্রামের ৫ জন, কিশোরগঞ্জের ২ জন এবং ঢাকা, গাজীপুর, শরীয়তপুর ও নারায়ণগঞ্জের ১ জন করে শিক্ষার্থী রয়েছেন। অর্থাৎ প্রায় ৬৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর বাড়িই বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলে। একই চিত্র মার্কেটিং ও লোকপ্রশাসন বিভাগেও। মার্কেটিং-এর ক্লাসে উপস্থিত হওয়া ৪৩ জনের মধ্যে ৩২ জন শিক্ষার্থীর বাড়ি কুমিল্লা অঞ্চলে। যা প্রায় ৭৪ শতাংশ। লোকপ্রশাসন বিভাগেরও প্রায় ৭০ শতাংশ কুমিল্লা অঞ্চলের।

শুধু এসব বিভাগই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগেই প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কুমিল্লা অঞ্চলের। এ পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অন্যতম বড় বাধা হবে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা। এদিকে ইউনিটভেদে ১০ থেকে ১৩ টি মেধাতালিকা প্রকাশের পরেও বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট ১ হাজার ৪০টি আসনের মধ্যে ১৪৩টি আসন ফাঁকা রয়েছে। যা মোট আসনের ১৪ শতাংশ। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এছাড়া ভোগান্তির অপর নাম যেন গুচ্ছ পদ্ধতির এ ভর্তি পরীক্ষা। এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটোছুটি, এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বাতিল করে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, অতিরিক্ত খরচ ও সময়ের অপচয়ের কারণে এ পদ্ধতি বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এছাড়া এ পদ্ধতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারাবে বলেও জানান তারা।

মার্কেটিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছেন কুমিল্লার মেয়ে আফসানা আফরোজ মীম। গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গুচ্ছ পদ্ধতির কারণে শুধু শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিই বেড়েছে। এরমধ্যে পজিটিভ কিছুই আমার মনে হয়নি। শুধু একের পর এক হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ২০ টি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে পরীক্ষায় বসতে দিয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থীকে। এছাড়া পরীক্ষার আগ মুহুর্তে বিভাগ পরিবর্তন ইউনিট বাদ দেয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, খরচের বিষয়ে বলতে গেলে কয়েকগুণ বেশী হয়েছে। একবার পরীক্ষার আবেদন ফি আবার প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ইউনিটে আবেদনের জন্য আলাদা আলাদা ফি গুনতে হয়েছে। আর ভর্তি বাতিল, মাইগ্রেশন খরচ ও দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াতের খরচ তো আছেই। পুরো প্রক্রিয়াটাই একটা অব্যবস্থাপনায় ঘেরা। ম্যাথ না দাগিয়েও ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবার অনেক আসন খালি থাকবে। অথচ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিটের জন্য হাহাকার করছে। নেগেটিভ দিক অনেকগুলো বলা যাবে। আমি মনে করি, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্বকীয়তা রয়েছে। গুচ্ছ পদ্ধতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বকীয়তা নষ্ট করছে।

লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রশিদুল ইসলাম শেখ বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা ছুটে আসবে। বিদেশি শিক্ষার্থী আসবে। জ্ঞান অর্জন করবে। এর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বিনিময় হবে। এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ। অথচ গুচ্ছের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো আঞ্চলিক হয়ে পড়ছে। এটা বিশ্ববিদ্যালয় শব্দের সাথে মানানসই না। তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য কই থাকলো! গুচ্ছের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় শব্দকে ছোট করা হচ্ছে।

‘এ’ ইউনিটের আহবায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. দুলাল চন্দ্র নন্দী বলেন, এ পদ্ধতি কোনভাবেই শিক্ষার্থীবান্ধব নয়। ইউনিটের দায়িত্ব পালন করার কারণে দেখেছি, এর মাধ্যমে সময় এবং অভিভাবকদের আর্থিক হয়রানি বহুগুন বেশি। একেরপর এক মেধাতালিকা দিয়েও আসন পূরণ করা যাচ্ছে না। আবার একজন শিক্ষার্থীর ব্যাপক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একটি পরীক্ষা খারাপ হলে গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভর্তির সুযোগ হারাবে। এর পজেটিভ দিকের চেয়ে নেগেটিভ দিক অনেক বেশি। আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়কে তার নিজস্ব ভর্তি প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়া উচিৎ।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. এফ. এম. আবদুল মঈন বলেন, গুচ্ছের ভালো এবং খারাপ দিক নিয়ে আমাদের উপাচার্যদের সভায় আলোচনা হয়েছে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই গুচ্ছের বিপক্ষে মত দেয়নি। এর ভালো-খারাপ দুটো দিকই আছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেক হোল্ডারদের সাথে কথা বলবো। এছাড়া একাডেমিক কাউন্সিলেও সিদ্ধান্ত নিব। কুবি গুচ্ছে থাকবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, গুচ্ছে থাকা না থাকার বিষয়ে এখনই বলা যাচ্ছে না। উপাচার্যদের সভায় মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে এ বিষয়ে সাক্ষাতের বিষয়ে একটি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Leave a Reply

সর্বশেষ