Wednesday, May 25, 2022

প্রকল্পের মেয়াদ শেষ, শুরু হয়নি রংপুর হাইটেক পার্ক নির্মাণকাজ

২০১৭ সালের জুলাইয়ে স্বপ্নের শুরু। রংপুরে নির্মিত হবে হাইটেক পার্ক। অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন মাত্রা। সরকারের এই প্রকল্প ঘিরে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর কর্মসংস্থানের আশায় বুক বাধে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী। কথা ছিল ২০১৮ সালে রংপুরে হাইটেক পার্ক নির্মাণ শুরু হবে। কিন্তু সাড়ে চার বছর পার হলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং নির্মাণকাজ শুরুর আগেই ২০২০ সালের জুনে শেষ হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। বহুল প্রত্যাশিত হাইটেক পার্কের নির্মাণ কাজ শুরু না হওয়ায় হতাশ রংপুরবাসী।

দেড়শ কোটির বেশি টাকা ব্যয়ে রংপুরে হাইটেক পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা হিসেবে নগরীর খলিশাকুড়িতে প্রায় ৯ একর খাস জমি বন্দোবস্ত করে দেয় রংপুর জেলা প্রশাসন। প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন, মাপজোক ও মাটি পরীক্ষার পর আর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটেনি। এ্যাপ্রোচ সড়কের জমি অধিগ্রহণে সৃষ্ট জটিলতার কারণে এর কার্যক্রম এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। যদিও জেলা প্রশাসকের দাবি হাইটেক পার্ক নির্মাণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তৎপর রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ৯ নং ওয়ার্ডের খলিশাকুড়ি এলাকায় হাইটেক পার্কের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে ৮ দশমিক ৫৯ একর জমি। দীর্ঘ দিন ধরে পিলার (খুঁটি) আর কাটাতারে ঘিরে রাখা জমিটি আবারো কৃষি কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এখন কাটাতারের বেড়া নেই, কমে গেছে সীমানা নির্ধারণে ব্যবহৃত পিলারের সংখ্যাও। আগের সাইনবোর্ডটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নতুন করে আরেকটি সাইনবোর্ড সেখানে বসানো হয়েছে। এখন প্রকল্পের তথ্য সংবলিত একটি মাত্র সাইনবোর্ডই হাইটেক পার্কের সাক্ষী।

এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে আবাদি জমির বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে স্বপ্নপূরণের ভবনগুলো। নকশানুযায়ী তিনটি ভবনের মধ্যে একটি হবে স্টিল স্ট্রাকচারে তৈরি ৭ তলাবিশিষ্ট ভবন। এছাড়া দুটি ৩ তলাবিশিষ্ট ক্যান্টিন ও এ্যাস্ফিথিয়েটার ভবন (স্টিল স্ট্রাকচার) এবং ডরমিটরি ভবন (আরসিসি) থাকবে। হাইটেক পার্ক বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রংপুরে কর্মসংস্থান হবে ৫ হাজার তরুণ-তরুণীর। এখানকার অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন মাত্রা। কিন্তু দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের অপেক্ষার পরও নির্মাণ কাজ শুরু না হওয়াতে হতাশ স্থানীয়রা।

২০১৯ সালের আগস্টে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন হাইটেক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা কমিটির পরিচালক হোসনে আরা বেগম। ওই সময় নির্মাণকাজ বিলম্ব হওয়ার কারণ সম্পর্কে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, ‘প্রকল্পটি ভারত সরকারের সহায়তায় হচ্ছে। আমাদের সব কাগজপত্র বারবার পাঠাতে হয় এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডিয়াতে। আবার সেখান থেকে চলে যায় ইন্ডিয়ান হাইকমিশনে। এসব প্রসেসের জন্য প্রকল্পের কাজে ধীরগতি এসেছে। তবে ২০১৯ সালেই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।’ তার এই আশ্বাসের পরও কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং ২০২০ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে কেটে গেছে আরও এক বছর আট মাস।

প্রকল্প এলাকা খলিশাকুড়ির স্থানীয় বাসিন্দা কলেজছাত্র ইমামুল বারী বলেন, এই হাইটেক পার্কের নকশা আর জমি অধিগ্রহণ ছাড়া বাকি কোনো কিছুতে তেমন অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। আমাদের অনেক আশা, পার্ক বাস্তবায়ন হলে এখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এলাকার উন্নয়ন হবে। তথ্য প্রযুক্তিগত সেবা আরও উন্নত ও সহজ হবে। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে নির্মাণ কাজ হবে হবে বলে শোনা গেলেও বাস্তবে এখনো কিছুই হয়নি।

একই এলাকার কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, এই খাস জমিতে আগে চাষাবাদ হতো। সরকার নাকি একটা পার্ক তৈরি করবে। এই জমি অধিগ্রহণ করেছে। কিন্তু চার বছরেরও বেশি সময় ধরে পার্কের জমি পড়ে আছে। কোনো কাজ হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে আমরা জমিতে চাষাবাদ শুরু করছি। পার্কের কাজ শুরু হলে কেউ জমিতে চাষাবাদ করব না।

এদিকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উমর ফারুক বলেন, প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ-তরুণী পড়ালেখা শেষ করছে। তাদের বেশির ভাগই শিক্ষিত বেকার হয়ে থাকছে। যেহেতু রংপুরে ভারী শিল্পকলকারখানা নেই, সেক্ষেত্রে আইটিনির্ভর হাইটেক পার্কটি গড়ে তোলা জরুরি। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আত্মনির্ভর হতে চাওয়া তরুণ-তরুণীরা বেশি উপকৃত হবে।

এই হাইটেক পার্ক প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পায়ন, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার শিল্পের উত্তোরণ ও বিকাশে সুযোগের দুয়ার খুলে দেবে বলে জানান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন ড. আবু কালাম মো. ফরিদ উল ইসলাম। তিনি বলেন, হাইটেক পার্ক বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের যুবকরা কাজের সুযোগ পাবে। তারা মেধা দিয়ে এ কাজ করবে। তথ্যের প্রসার ও আইটি বিভাগ আরও প্রসারিত ও জনবান্ধব হবে। ফলে বাংলাদেশে সফটওয়্যার শিল্পের আরও বিকাশ ঘটাবে। জাতীয় রাজস্ব আয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে এ পার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এদিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্মাণ কাজ শুরু করতে মন্ত্রণালয় ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে জানিয়েছে রংপুর জেলা প্রশাসক আসিব আহসান। তিনি বলেন, হাইটেক পার্কের জন্য প্রায় ৯ একর খাস জমি দেওয়া হয়েছে। এটি ইন্ডিয়ান লাইন অব ক্রেডিটের অর্থায়নে বাস্তবায়ন হবে। পার্কের প্রবেশমুখে যাতায়াতের জন্য কিছু জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার নামে এ পার্কের নামকরণের প্রস্তাবনাও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় চাইছে হাইটেক পার্কটি দ্রুত নির্মাণ করতে। নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে কর্তৃপক্ষও তৎপর রয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল সারাদেশের জেলা পর্যায়ে ১২টি হাইটেক পার্ক প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এর মধ্যে রংপুর হাইটেক পার্কের জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ১৫৪ দশমিক ৫৪ কোটি টাকা ধরা হয়। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এবং তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Leave a Reply

সর্বশেষ